নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 682 বার পঠিত

শরিয়াহভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি গভীর প্রশাসনিক সংকটে পড়েছে। এমডি পুনর্নিয়োগ নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে পরিচালনা পর্ষদ। বোর্ডের একাংশ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। বোর্ডে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাবিবুর রহমানের পুনর্নিয়োগ কেন্দ্র করে সৃষ্ট প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এমডি পুনর্নিয়োগের বিরোধীতা করে বোর্ডের একাংশ আদালতে অভিযোগ দায়ের করলে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর সেকশন ২৩৩-এর অধীন ধারা ৮৫(৩) এবং কোম্পানি আইন, ২০০৯-এর ধারা ৮ ও ২৬৩ অনুসারে গত ৭ জানুয়ারি বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে জানতে চেয়েছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পুনর্নিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাব এবং ব্যাংকের বোর্ড সভায় উত্থাপিত প্রস্তাব কেন আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই জারি করা হয়েছে বলে ঘোষণা করা হবে না। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমানের পুনর্নিয়োগ নিয়ে বোর্ড রুমের বিভক্তির মধ্যে আদালতের এই কারণ দর্শানো নোটিশ পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বোর্ডের একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ। অন্য পক্ষে আছেন তারই ছেলে এবং সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান এ কে এম আব্দুল আলীম। আলীমের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ বর্তমান এমডির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে পূর্ববর্তী মেয়াদে ইউনিয়ন ব্যাংকে ঋণ অনিয়মের অভিযোগ এনে তাকে অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, গত ৭ জানুয়ারি বোর্ড মিটিংয়ে এমডি পুনর্নিয়োগ (১৫ নম্বর কার্যবিধি) নিয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই শেষ হয়। এর পরে আলাদা করে বোর্ড চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বৈঠক করে এমডি মো. হাবিবুর রহমানের পুনর্নিয়োগের বিষয়টি কার্যবিবরণীতে সংযুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকে এনওসি-এর জন্য প্রেরণ করে এবং সেই বোর্ড মিটিংয়েই ভাইস চেয়ারম্যান এ কে এম আব্দুল আলীমকে সরিয়ে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য গুলজার আহমেদকে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জনসংযোগ বিভাগের এভিপি মো. সোহেল রহমানী বলেন, ‘বোর্ড মিটিং থেকেই একজন উঠে গিয়েছিলেন, আলাদা করে কোন বৈঠক হয়নি।’ এ বিষয়ে বোর্ড পরিচালক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এ কে এম আব্দুল আলীম বলেন, ‘বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন বলে আমি কোন মন্তব্য করবো না।’
এমডি পুনর্নিয়োগের বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ব্যাংকের ভেতরে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। এক পক্ষ বর্তমান এমডিকে পুনর্বহালের পক্ষে অবস্থান নিলেও অন্য পক্ষ তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পুনর্নিয়োগের বিরোধিতা করেছে। বিরোধী পক্ষের দাবি, বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে পুনরায় শীর্ষ নির্বাহী পদে বহাল রাখা হলে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইউনিয়ন ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে থাকাকালীন মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়ম, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং দুর্নীতির অভিযোগ এবং দুদকের মামলায় স্থগিতাদেশ রয়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংকে থাকাকালে এস আলম গ্রুপের অনুকূলে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি অনিয়মিত ঋণ অনুমোদনে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে বলা হয়, যেহেতু কোন মামলায় তিনি (মো. হাবিবুর রহমান) সাজাপ্রাপ্ত নন এবং অপরাধী হিসাবে প্রমাণিত হননি সুতরাং বিষয়টি আলোচনায় আসবে না। মো. হাবিবুর রহমানকে ইতিপূর্বে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনপত্রেও উল্লেখ করা হয়েছিল ‘যদি দুদকের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন তাহলে এমডি হিসাবে অনুমোদনের সিদ্ধান্তটিও পরিবর্তন হবে।’ এ বিষয়ে এমডি মো. হাবিবুর রহমানের মন্তব্য জানতে গেলে তিনি ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠেন। প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং বলেন, ‘যা খুশি লিখতে পারেন’- কোন সংবাদপত্রকে তিনি তোয়াক্কা করেন না বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের ক্ষোভ: গত ১৫ জানুয়ারি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ব্যাংকটির বোর্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সাংবাদিকের সঙ্গে এমডি’র বাজে আচরণ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যাপারে আমরা খুবই বিরক্ত। আজকেও আমরা তাদেরকে বলেছি যে, তোমরা বোর্ডের কোন্দল মীমাংসা কর তাছাড়া এমডি পুনর্নিয়োগের বিষয়ে তো সিদ্ধান্ত হবেই না বরং আরও কঠোর ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা বার বার শুদ্ধ হতে বলছি, যদি তারা শুদ্ধ না হয় তাহলে আমরা আরো কঠোর হবো।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রশাসনিক অচলাবস্থা আরও গভীর হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদের দ্বন্দ্ব, আইনি জটিলতা এবং শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। দ্রুত আইনসম্মত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত না এলে ব্যাংকটির সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Posted ৯:০৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy


